রচনাঃ বাংলাদেশের কৃষক


বাংলাদেশের কৃষক

ভূমিকাঃ বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের প্রায় ৭৫% লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল । দেশের মোট রপ্তানি আয়ের দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৭% আসে কৃষিখাত থেকে । তাই এদেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সর্ম্পূণভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল । আর এ কৃষির ব্যবস্থার সাথে মিশে থাকে বাংলার কৃষক। এ কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফলানো ফসল দিয়েই ঘোরে আমাদের অর্থনীতির চাকা । তাই তো কবি বলেন-

‘‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা।’’

কৃষি ও কৃষকঃ বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় ভাবে সম্পর্কিত হলো এদেশের কৃষি ও কৃষক । এদেশের খেটে খাওয়া আপামর জনসাধারণ রোদে পুুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সোনার ফসল উৎপাদন মাধ্যমে যে পেশার জীবিকা নির্বাহ করে, সেটাই হলো কৃষি। বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোর হচ্ছে কৃষিভিওিক । আর কৃষি কাজ করে যার জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাই হলেন কৃষক। কৃষককুলের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে, ত্যাগে, ঘামে গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনীতি । দুঃখ দারিদ্র ,লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করে তারা যেভাবে দেশের ও দশের সেবা করে যাচ্ছে তার তুলনা নেই। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এদেশ ভরে উঠে ফসলের সমারোহ আর আমরা পাই ক্ষুদার অন্ন। কৃষকের উৎপাদিত কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ হয় বৈদেশিক মুদ্রায়, সম্ভব হয় শিল্পায়ন । তাই এদেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কৃষি ও কৃষক।

কৃষকের গুরুত্বঃ বাংলার কৃষক হচ্ছে বাংলার কৃষির প্রাণ । তাই বলা হয়ে থাকে কৃষকের জাতির মেরুদন্ড । কৃষকের উৎপাদিত পণ্যে এদেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল থাকে। জাতীয় আয় সৃষ্টিতে কৃষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবাদি যোগায় আমাদের কৃষকই । কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে ও বিদেশ রপ্তানি করে বৈদিশক মুদ্র অর্জিত হয়। বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করেই অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এ পাট কৃষকের উৎপাদিত পণ্য । এদেশের অধিকাংশ খাদ্যের যোগানদাতা কৃষক। ভাত, ডাল, আলু, তরকারি বাঙালির প্রধান খাদ্য। এগুলো সবই কৃষক উৎপাদন করে। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফলানো এ ফসল দিয়েই আমরা জীবন নির্বাহ করি। বাংলা ও বাঙালির জন্য তাই কৃষক মহান ঈশ্বরের আশীর্বাদস্বরুপ। তাই আমাদের জীবনে কৃষকের গুরুত্ব অপরিসীম।

কৃষকের জীবনঃ বাংলাদেশের কৃষকগণ অতি সহজ ও সরল জীবন যাপন করে। তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল হালের গুরু ও পুরাতন ভোতা কৃষি যন্ত্রপাতি । তারা ভাগ্যের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে কাজ করে যায়। সারাদিন মাঠে কাজ করতে ভালোবাসে। রোদ বৃষ্টি তাদেরকে কাবু করতে পারে না। মাঠভরা সোনার সোনার ফসল দেখলে তাদের মন আনন্দে নেচে উঠে ।

কৃষকের অতীত ব্যবস্থাঃ কৃষকের গ্রাম বাংলার কৃষকদের জীবন ছিল সুখী ও স্বচ্ছল । তারা যে ফসল ফলাতো তা দিয়ে তারা সারা বছর ভালোভাবে কাটাতে পারত। তখন তাদের ছিল গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গুরু এবং পুকুরভরা মাছ। তাদের হৃদয় ছিল হাসি ও আনন্দ ভরপুর। জমির তুলনায় লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই অভাব অনটন মোটেই ছিল না। অভাব অনটন না থাকায় বাংলার কৃষক মনের আনন্দে দ্বিগুন পরিশ্রম করে আর ও বেশি সোনালি ফসল ফলাতো । জমির তুলনায় লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই অভাব অনটন মোটেই ছিল না। অভাব অনটন না থাকায় বাংলার কৃষক মনের আনন্দে দ্বিগুন পরিশ্রমে করে আর ও বেশি সোনালি ফসল ফলাতো। এ ফসল দিয়ে অতীতে কৃষক হাসিমুখে জীবিকা নির্বাহ করতে পারত।

কৃষকদের বর্তমান অবস্থাঃ কৃষদের অতীতের সচ্ছলতা এখন আর নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সার,বীজ,মূলধনের অভাব, জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, ভূমির উর্বরতা হ্রাস ইত্যাদি বহুবিদ ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে বাংলার কৃষক এখন আর আগের মতো ফসল ফলাতে পারে না। তারা নানা অভাব অনটন ও রোগ শোকে জর্জরিত । আজ তারা সর্বহারা। তাদের মুখে সেই হাসি নেই। তাদের পেটে নেই ভাত, পরণে নেই কাপড়, ক্ষেত্রের ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মহাজনদের দেনার দায়ে সেই ফসল বিক্রি করতে হয় নামমাত্র মূল্যে । ফলে সকল সুখ-স্বপ্ন থেকে তারা হয় বঞ্চিত। দারিদ্রের অভিশাপে সুচিকিৎসা পায় না । রোগ শোক তাদের জীবন সাথী । মৃত্যুকালে এরা উওরাধিকারীদের জন্যে রেখে যায় শুধু দারিদ্রের অভিশাপ।

কৃষকের দুর্দশার কারণঃ বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সওে¦ ও আমাদের কৃষি ব্যবস্থা খুবই অনুন্নত এবং কৃষকদের অবস্থা ও অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত। আমাদের কৃষকের এ দৈন্যদশার পিছনে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নানা কারণ বিদ্যমান। আমাদের দেশে লোকসংখ্যা তুলনায় জমির পরিমাণ খুবই কম। জমির স্বল্প আয়ে তাদের সংসার চলে না। তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত । তাই আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে তারা তারা অজ্ঞ। হাড্ডিসার গুরু ও ভোতা লাঙ্গল এখন ও তাদের সম্ভল । দারিদ্রের অভিশাপে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ওষুধ কিংবা উন্নতমানের সার ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্রমাগত একই চাষের একই চাষের ফলে জমির শক্তি হ্রাস পাওয়ার উৎপাদন কমে গেছে। আবার যে সামন্য ফসল পায় তার যথাযথ মূল্য না পাওয়াতে কৃষিঋণ এবং মহাজনের দেনা পরিশোধ করার জন্য কম দামে কৃষকের সব ফসল বিক্রি করে দিতে হয়। তাই উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই মালিকের নিকট চলে যায়। বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয় না। এ সময় মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের জন্য গভীর নলকূপ বসানোর সামর্থ্য ও কৃষকের থাকে না। ফলে কৃষি উৎপাদন বিঘ্ন ঘটে। আবার বন্যা জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবছর হাজার হাজার একর জমির ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায় বা নষ্ট করে। এতে কৃষকের দুর্দশা আরো বেড়ে যায়। আবার বর্ষা মৌসুমে কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কৃষক তিন মাস বেকার থাকে। ফলে কৃষক দরিদ্র থেকে হত দরিদ্র হয়।

দুর্দশা দূূরীকরণের উপায়ঃ কৃষিই অর্থনীতির মেরুদন্ড । আর কৃষির সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষকের প্রাণ। কৃষির উন্নতি না হলে কৃষকের উন্নতি হবে না। কৃষির উন্নতি যদি বাধাগ্রস্ত হয় তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষির উন্নতি সাধিত হলে কৃষকের ও দুর্দশা লাঘব হবে। পদক্ষেপ ও নিতে হবে। এ ব্যাপারে কৃষকদের মধ্যে চেতনাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। পুরানো আমলের চাষাবাদ প্রণালি পরিবর্তন করে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত চাষাবাদ প্রবর্তন করতে হবে। আমাদের কৃষকগন শিক্ষিত নয়। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা সর্ম্পকে তাদের জ্ঞান নেই। তাই কৃষি বিশেজ্ঞ ও কৃষি কর্মকর্তাদের সক্রিয় সহযোগিতা কৃষক সম্প্রদায়কে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা সর্ম্পকে সচেতন করে তুলতে হবে।কৃষকদের উন্নতির জন্য র্দীঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও সুষ্টু সরকারি নীতি গ্রহন করা প্রয়োজন। গ্রামে গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করে সমবায় বা যৌথ খামার ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনের সময় কম দামে কৃষকদের সার ও কীটনাশক সরবারাহ করতে হবে। কৃষকরা যাতে কম মূল্যে সেচযন্ত্র ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার পানি যাতে ফসলের ক্ষতি করতে পারে সে জন্য নদীর তীরে বড় বড় বাধঁ নিমার্ণ কিংবা নদী খননের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকে ভূমি সংস্কার করার লক্ষ্যে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহন এবং সুনিদিষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। কৃষকের মধ্যে সহজ শর্তে প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদানের জন্য সমবায় ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের সম্প্রসারণ করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দ্বারা কৃষকদের উৎসাহিত করা যেত পারে। এ সকল উদ্যোগ গ্রহন করলে বাংলার কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের পথ অত্যন্ত সুগম হবে।

কৃষকের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাবলিঃ কৃষকদের জীবনাযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বাংলার কৃষকের দারিদ্র বিমোচনে যথেষ্ট সহায়তা দান করছে। যেমন ঃ বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নে বোর্ড দারিদ্র বিমোচনে টার্গেট গ্রুপের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেছে। এ ছাড়া হালের বলদ,উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, ইত্যাদির সরকার কৃষকদের মধ্যে কৃষিঋণ দিচ্ছে। ট্রাক্টর এবং গ্রভীর ও অগভীর নলকূপ ব্যবহারে সরকার কর্তৃক গৃহীত এসব ব্যবস্থাবলি প্রশংসনীয়। এর ফলশ্রুতিতে বাংলার দরিদ্র কৃষকদের উন্নয়নে ব্যপারে সকলেই আশাবাদী হয়েছে।

উপসংহারঃ কৃষকদের ভাগ্যের সঙ্গে এ দেশের অগণিত মানুষের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে জন্য এদেশের উন্নতি করতে হলে প্রথমে কৃষকদের উন্নতি সাধন করতে হবে। তা না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হবে।

রচনাঃ বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
Previus
রচনাঃ বাংলাদেশের নদ নদী
Next

Share This Post


Suggestion or Complain

সংবাদ শিরোনাম